ঢাকা | খ্রি.

অর্থবছর বদলাচ্ছে: ২০২৭-২৮ হবে ৯ মাসের, নতুন চক্র শুরু ২০২৮-২৯ থেকে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 19, 2026 ইং | Photo Card
অর্থবছর বদলাচ্ছে: ২০২৭-২৮ হবে ৯ মাসের, নতুন চক্র শুরু ২০২৮-২৯ থেকে ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728

নিউজ বাংলা ডেস্ক: দীর্ঘ প্রায় ৫৫ বছর পর দেশের অর্থবছরের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। বর্তমানে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থবছর গণনা করা হলেও ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে তা পরিবর্তন করে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিবর্তনের আগে ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে অন্তর্বর্তী বা ট্রানজিশনাল অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করে নয় মাসে শেষ করা হবে।

সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অর্থবছরের সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়টি জানানো হয়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৭-২৮ অর্থবছর শেষ হবে ২০২৮ সালের মার্চে। এরপর ২০২৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৯ সালের মার্চ পর্যন্ত চলবে ২০২৮-২৯ অর্থবছর। অর্থাৎ ওই সময় থেকেই এপ্রিল-মার্চ চক্রে ফিরবে দেশের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা।

কেন পরিবর্তন

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জুলাই-জুন অর্থবছরের কারণে বর্ষাকালে অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জনদুর্ভোগও বাড়ে।

নতুন এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু হলে বর্ষা শুরুর আগেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমের বড় অংশ শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার। একই সঙ্গে অর্থবছরের শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করা, বিল সমন্বয় কিংবা অর্থ ব্যয়ের প্রবণতাও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বড় ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি প্রয়োজন

অর্থবছরের সময়সূচি পরিবর্তনকে শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রায় পুরো কাঠামোকেই নতুন সময়চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, লেজিসলেটিভ বিভাগ, অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি কমিটি পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে। প্রয়োজনে সংবিধান ও জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এ সংশোধনী আনতে হবে।

একই সঙ্গে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। আয়কর ও রিটার্ন জমা, ভ্যাট, ব্যাংক ও বিমা খাতের হিসাব, কোম্পানির অডিট, সরকারি ক্রয়, অর্থছাড় এবং বাজেট ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সময়সীমা নির্ধারণের প্রয়োজন হবে।

অর্থবছর কেন গুরুত্বপূর্ণ

অর্থবছর হলো সরকারের আয়-ব্যয়, বাজেট প্রণয়ন ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ১২ মাসের একটি আর্থিক চক্র। দেশের রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, ঋণ, উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষে জুলাই-জুন অর্থবছর চালু হয়। পাকিস্তান আমলেও একই ব্যবস্থা বহাল ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ৩০ জুন ১৯৭২ পর্যন্ত একটি সংক্ষিপ্ত অর্থবছরের বাজেট দিয়েছিলেন। এরপর ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন সময়কালই বাংলাদেশের নিয়মিত অর্থবছর হিসেবে বহাল রয়েছে।

সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমত

অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মো. আহসান হাবিব মনে করেন, নতুন অর্থবছর বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করলেই উন্নয়ন প্রকল্পের সব সমস্যা দূর হবে না। বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সংস্কার প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বর্ষাকালকে কেন্দ্র করে অর্থবছর পরিবর্তনের যুক্তি পুরোপুরি কার্যকর নয়। কারণ এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু হলেও বাংলাদেশের বর্ষাকাল থেকেই যাবে। ফলে বর্ষাজনিত চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি দূর হবে না।

তার মতে, বাংলাদেশের মোট বাজেটের বড় অংশই রাজস্ব ব্যয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো খাতগুলোতে বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বলতার সঙ্গে বর্ষার সরাসরি সম্পর্ক নেই। একইভাবে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হয়ে একাধিকবার সংশোধিত হয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল সমস্যা শুধু অর্থবছরের সময়সূচির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

কৃষি ও উন্নয়ন খাতে সম্ভাব্য প্রভাব

নতুন অর্থবছর কৃষি খাতেও কিছু সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ধান-চাল সংগ্রহ, সার ও বীজে ভর্তুকি এবং কৃষি কার্যক্রমের সঙ্গে বাজেট পরিকল্পনার সমন্বয় সহজ হতে পারে।

বিশেষ করে বর্ষা শুরুর আগে রাস্তা, সেতু, কালভার্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শেষ করার সুযোগ বাড়লে উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মানও উন্নত হতে পারে। জুন মাসের শেষ দিকে অর্থবছরের বরাদ্দ শেষ করার জন্য যে ধরনের তাড়াহুড়ো দেখা যায়, নতুন সময়সূচিতে তা কমানোর সুযোগ রয়েছে।

বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে

অর্থবছর পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাষ্ট্রের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নতুন চক্রে নিয়ে আসা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ও বাজেট ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি হালনাগাদ করতে হবে।

একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্পগুলোর মেয়াদ, অর্থছাড়ের সময়, ক্রয় প্রক্রিয়া, অডিট, কর ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব সমন্বয় করতে হবে। বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হিসাব ও রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রেও নতুন সময়চক্রের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক মনে করেন, আবহাওয়া ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয়ের দিক থেকে সিদ্ধান্তটির ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের আগে আর্থিক হিসাব কীভাবে সমন্বয় করা হবে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কতটা প্রস্তুত এবং প্রকল্পগুলোর মেয়াদ কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

শুধু অর্থবছর বদলালেই কি বদলাবে উন্নয়ন বাস্তবতা?

অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের ফলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন সুযোগ তৈরি হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে আরও গভীর সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

রাজস্ব আদায়, সরকারি ক্রয়, অর্থছাড়, প্রকল্প তদারকি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মন্ত্রণালয়গুলোর বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা না বাড়লে শুধু অর্থবছরের সময়সূচি পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

তাই ২০২৭-২৮ সালের নয় মাসের ট্রানজিশনাল অর্থবছর শুধু একটি পরিবর্তনকাল নয়; বরং বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে নতুন সময়চক্রে রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিকাল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
চ্যাম্পিয়ন পিএসজিকে হারিয়ে শীর্ষে বায়ার্ন

চ্যাম্পিয়ন পিএসজিকে হারিয়ে শীর্ষে বায়ার্ন