ঢাকা | খ্রি.

তালেবান শাসনের পাঁচ বছরে কঠোর বিধিনিষেধে আফগান নারীদের জীবন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 15, 2026 ইং | Photo Card
তালেবান শাসনের পাঁচ বছরে কঠোর বিধিনিষেধে আফগান নারীদের জীবন ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728
নিউজ বাংলা ডেস্ক : ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর গত পাঁচ বছরে দেশটির নারী ও মেয়েদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। একই সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন অনেক আফগান নারী।

প্রায় দুই দশক যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সঙ্গে যুদ্ধের পর তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তারা আবার আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর থেকেই নারী ও মেয়েদের ওপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

বিবিসি কাবুলসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন শহর এবং প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তালেবান শাসনে আগের জীবন থেকে তারা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মেয়েদের শিক্ষায়।

১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ রয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের হিসাবে, প্রায় ২৬ লাখ মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি শেষ করার পর আর স্কুলে যেতে পারছে না। সরকারি পর্যায়ে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ থাকা বিশ্বের একমাত্র দেশ এখন আফগানিস্তান।

কাবুলের শাকিবার কাছে তালেবানের ক্ষমতা দখলের দিনটি তার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিনগুলোর একটি। তিনি জানান, প্রতিবছর ১৫ আগস্ট এলে তার মনে হয় পুরোনো কষ্ট আবার ফিরে আসে। দীর্ঘদিন ধরে লালন করা স্বপ্নগুলো যেন এক মুহূর্তেই তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

অনলাইনে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পারলেও শাকিবার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল পাইলট হওয়া। ছোটবেলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেকে উড়োজাহাজ চালানোর কল্পনা করতেন তিনি। স্বাধীনভাবে আকাশে উড়ে সীমাহীন পৃথিবী দেখার ইচ্ছা ছিল তার। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন আর সম্ভব নয় বলেই মনে করেন শাকিবা।

তবে নারীদের শিক্ষা নিয়ে তালেবানের অবস্থান ভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। বিবিসির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারীদের জন্য সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়নি। তার দাবি, বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ মেয়ে স্কুল ও মাদরাসায় পড়াশোনা করছে। নারীদের জীবন ও কাজের সব ক্ষেত্র বন্ধ না করে কিছু কার্যক্রম সাময়িকভাবে সীমিত করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে তালেবানের এই বক্তব্যের সঙ্গে আফগান নারী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যের বড় পার্থক্য রয়েছে।

শিক্ষার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও নারীরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে মাত্র ৭ শতাংশ নারী কর্মরত। সংবাদ উপস্থাপক জুহাল তালেবানের বিধিনিষেধের কারণে চাকরি হারিয়েছেন। তার কাছে টেলিভিশনে সংবাদ পড়া শুধু পেশা ছিল না, বরং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল।

জুহাল বলেন, ক্যামেরার সামনে বসে সংবাদ পড়ার সময় তিনি গর্ব ও আনন্দ অনুভব করতেন। ধীরে ধীরে কাজটি তার পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল। এখন সেই জীবন আর নেই। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তিনি জানেন, পুরো দিন তাকে বাড়িতেই থাকতে হবে।

অন্যদিকে আমির খান মুত্তাকির দাবি, নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। তার হিসাবে, ২০২০ ও ২০২১ সালে আফগানিস্তানে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নারী ছিলেন প্রায় ৩০ হাজার। বর্তমানে এই সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজার হয়েছে। তালেবানের দাবি, নারীরা শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী ও উদ্যোক্তা হিসেবেও কাজ করছেন।

চলাফেরার ক্ষেত্রেও নারীদের নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। পুরুষ অভিভাবক ছাড়া দূরের যাত্রা করার ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে নিজেদের জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন অনেক নারী।

কাবুলের এলা জানান, দারিদ্র্য ও দৈনন্দিন সমস্যার চাপ এতটাই বেড়েছে যে অনেকে শিক্ষা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা করা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তার মতে, অনেকের কাছে এখন টিকে থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার মতো সময় বা শক্তি তাদের নেই।

এদিকে তালেবান আবার প্রকাশ্যে শারীরিক শাস্তি কার্যকর করা শুরু করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে শত শত মানুষকে বেত্রাঘাত করা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

শাইমা নামের এক নারী জানান, তাকে ৫০ বার বেত্রাঘাত করা হয়েছিল। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর দাগ তৈরি হয় এবং ঘটনার পর তার পরিবারও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে জোর করে একটি কাগজে স্বীকারোক্তি দিতে হয়েছিল। সেখানে তাকে ধর্মত্যাগী এবং অবিশ্বাসীদের সহযোগী হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। অপরিচিত পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল।

শাইমা জানান, বেত্রাঘাতের সময় এত জোরে আঘাত করা হচ্ছিল যে তার মাথা বারবার মাটির দিকে নুয়ে যাচ্ছিল। ওই শাস্তি দেখার জন্য প্রায় ২০০ স্থানীয় মানুষ জড়ো হয়েছিল। তাদের মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি কিশোর ও শিশুরাও ছিল। সবার সামনে তাকে নিজের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়ার কথা বলতে হয়।

এই ঘটনার মানসিক প্রভাব তার মেয়ের ওপরও পড়েছে। শাইমা বলেন, তার বড় মেয়ে প্রায় প্রতি রাতেই ভয় পেয়ে ঘুম থেকে ওঠে এবং মাকে বলে, ‘তারা তোমাকে মারছে’ বা ‘তারা তোমাকে মেরে ফেলছে।’ মেয়ের এই আতঙ্কই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

মানিজা নামের আরেক নারী এক পুরুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের অভিযোগে প্রকাশ্যে ৩৯ বার বেত্রাঘাতের শিকার হন। পরে তাকে কারাগারেও পাঠানো হয়। তিনি জানান, ওই পুরুষের সঙ্গে তার বিয়ের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তালেবানের গোয়েন্দারা তাদের গ্রেপ্তার করেন।

কারাগারে থাকার সময় ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন মানিজা। একসময় তার বেঁচে থাকার ইচ্ছাও হারিয়ে যায়। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন বলেও জানান তিনি। গ্রেপ্তার ও শাস্তির পর পরিবার ও বন্ধুদের কাছে নিজেকে লজ্জার কারণ বলে মনে হতে শুরু করে তার।

নারীদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও আফগানিস্তানে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। দেশটিতে মাতৃমৃত্যুর হার বিশ্বের অন্যতম বেশি। নারী চিকিৎসকের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং পুরুষ চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে থাকা বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে অনেক নারী ও মেয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ধাত্রী মারজিয়া জানান, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে চিকিৎসাকেন্দ্রে আসা ৪৫ বছর বয়সী ছয় সন্তানের এক মাকে তার চোখের সামনে মারা যেতে দেখেছেন। শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হলেও মাকে বাঁচানো যায়নি।

মারজিয়া বলেন, ওই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখনো চিন্তা করেন। মা ছাড়া শিশুটি ও তার ভাইবোনেরা কীভাবে বড় হবে—এই প্রশ্ন তাকে ভাবায়। একজন রোগীকে হারানো চিকিৎসাকর্মীদের জন্য সবচেয়ে কষ্টকর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এমন ঘটনায় তারা শারীরিক ও মানসিক—দুই দিক থেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

মরিয়মও নিজের অনাগত কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার আশঙ্কা, তালেবানের বর্তমান বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে তার মেয়ে হয়তো পড়াশোনা শেষ করার সুযোগই পাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে।

মরিয়মের আরেকটি উদ্বেগ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে। ভবিষ্যতে তার মেয়ে বিয়ে করে সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় যদি নারী চিকিৎসকের প্রয়োজন হয়, কিন্তু পর্যাপ্ত নারী চিকিৎসক না থাকেন, তাহলে পরিস্থিতি জীবন-মরণের সংকটে পরিণত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু আফগান নারী এখনো নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা ছাড়েননি। ২৪ বছর বয়সী নূরি নারীদের অধিকার রক্ষায় আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়তে চেয়েছিলেন। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর তার পড়াশোনা শেষ করা সম্ভব হয়নি। এরপর আর্থিকভাবে স্বাধীন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি জ্যাম তৈরির প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন তিনি।

নূরি সেখানে তিন বছর ধরে কাজ করছেন। এখন নিজের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার। একই সঙ্গে অন্য নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও তার লক্ষ্য। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে ১০ জন নারী কাজ করছেন। নূরি বলেন, তিনি চান অন্য নারীরাও তার মতো স্বাধীন, শক্তিশালী ও সফল হয়ে উঠুক।

১৩ বছর বয়সী আসামার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। স্কুলে পড়ার সুযোগ না থাকলেও পরিস্থিতি একদিন বদলাবে এবং তিনি চিকিৎসক হতে পারবেন—এমন আশা এখনো ধরে রেখেছে সে। আসামার বিশ্বাস, একদিন সবকিছু পরিবর্তিত হবে। সেই সময়ের অপেক্ষায় ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে এবং আশা হারানো যাবে না।

দাঁতের চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কাজ করা এলা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আফগান নারী ও মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, বিশ্বের মানুষের উচিত আফগান নারীদের কথা তুলে ধরা এবং তাদের শিক্ষা ও কাজের অধিকারকে সমর্থন করা।

আফগান নারীদের পরিস্থিতির ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর রাখা জরুরি বলেও মনে করেন এলা। তার ভাষায়, আফগান নারীদের এখন নীরবতার চেয়ে সংহতি বেশি প্রয়োজন।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ