ইসরায়েল ও জার্মানির সম্পর্ক যুগের পর যুগ ধরে ঘনিষ্ঠ ও বহুমাত্রিক। ইতিহাসের ভার, সামরিক সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং কূটনীতি সব মিলিয়ে জার্মানির অবস্থান জটিল এবং প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু গাজার চলমান সংঘাতের মাঝে এই সম্পর্কের মানবিক দিকের প্রভাব বোঝা একেবারেই সহজ নয়।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস তার মেয়াদ শুরু করার পর প্রথমবার ইসরায়েল সফরে গিয়েছেন। সফরটি এমন সময়ে ঘটছে যখন জার্মানি সাম্প্রতিক তিন মাসের অস্ত্র রপ্তানি স্থগিতাদেশ তুলে নিয়েছে। মের্ৎস বলেছেন, তিনি গাজার পরিস্থিতিকে জেনোসাইড হিসেবে দেখেন না। সফরে তার আলোচনার বিষয়বস্তুতে রয়েছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, গাজার যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক সহযোগিতা।
অস্ত্র রপ্তানি : দায়বদ্ধতা বনাম কূটনৈতিক বন্ধন
জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের পর ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (এসআইপিআরআই)-এর তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে জার্মানির সরবরাহকৃত সামরিক সরঞ্জামের পরিমাণ প্রায় ৩০%।
প্রধান সরঞ্জামগুলির মধ্যে রয়েছে নৌসামরিক সরঞ্জাম, ডলফিন-ক্লাস সাবমেরিন, ট্যাঙ্ক, রকেট লঞ্চার এবং অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তি। বিশেষ করে ডলফিন সাবমেরিনগুলো গাজার নৌনিষেধাজ্ঞা এবং হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
২০২৩ সালে জার্মানি ইসরায়েলের জন্য ৩২৬.৫ মিলিয়ন ইউরোর অস্ত্র রপ্তানি অনুমোদন দিয়েছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি। মের্ৎস আগের বছর এই রপ্তানি স্থগিত করেছিলেন, মানবিক প্রভাব বিবেচনা করে, কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর পুনরায় রপ্তানি চালু হয়েছে।
বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক
জার্মানি ইসরায়েলের পঞ্চম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বড়। ২০২৩ সালে ইসরায়েল ২.৬৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিক্রি করেছে, আর জার্মানি ইসরায়েলে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য পাঠিয়েছে। প্রধানত যন্ত্রপাতি, গাড়ি, ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য, উন্নত প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্সের ওপর এই ব্যবসা চলে।
সিমেন্স এবং বায়ার-এর মতো বড় কোম্পানি ইসরায়েলের প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিনিয়োগ করছে। সামরিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের সঙ্গে এই বিনিয়োগ জার্মানির কূটনৈতিক প্রভাবও বাড়াচ্ছে।
গাজার মানবিক বাস্তবতা : জীবনযুদ্ধে সাধারণ মানুষ
গাজার সাধারণ মানুষ এখনো ভয়াবহ মানবিক সংকটে আছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও কমপক্ষে ৩৬০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৯২২ জন আহত হয়েছে। মানবিক সহায়তা মাত্র ২০% পৌঁছেছে।
এক স্থানীয় বাসিন্দা ফাতিমা আল-নাসর বলেন, আমরা এখন এমন একটি জীবনযুদ্ধে আছি, যা শেষ হবার নয়। আমরা যুদ্ধবিরতির আশা করছি, কিন্তু যখন-তখনব হামলার ভয়ে শিশুরা রাতের অন্ধকারে কাঁদছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি বলেন, এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি স্থায়ী বিরতি মাত্র, সত্যিকারের শান্তি এখনো অনেক দূর।রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব
গত দুই বছরে জার্মানিতে প্রায় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ৮০১টি প্রতিবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ৬৭০টি ফিলিস্তিনি সমর্থকগোষ্ঠী দ্বারা। জার্মানি এখনও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি। জাতিসংঘে তারা সতর্ক কৌশল অবলম্বন করে, অনেক ভোটে অনাস্থা প্রদর্শন করে বা নিরপেক্ষ থাকে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইতিহাস এবং হলোকাস্টের প্রেক্ষাপট জার্মানির কৌশলকে প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ডঃ সোফিয়া ক্রুগার বলেন, জার্মানির ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন শুধু সামরিক বা বাণিজ্যিক নয়। এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক বন্ধন, যা হলোকাস্টের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। তবে এই নীতি গাজার সাধারণ মানুষকে সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
নৈতিক দ্বিধা : অস্ত্রের দাম বনাম মানবতার ব্যর্থতা
গাজার মানুষদের উপর চাপ এবং নৈতিক দ্বিধা জার্মানির কূটনীতির মধ্যে স্পষ্ট। অস্ত্র রপ্তানি, কূটনীতি, বাণিজ্য সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন হয়ে পড়ছে।
একজন মানবাধিকারকর্মী বলেন, জার্মানি ইসরায়েলের রাইট টু ডিফেন্ড নীতিকে সমর্থন করে, কিন্তু সেখানকার বেসামরিক মানুষদের প্রতি দায়বদ্ধতা কতদূর? এই প্রশ্নই আমাদের নৈতিক ব্যর্থতার মুখোশ খুলে দেয়।
গাজার জীবনযুদ্ধ এখনও চলমান, আর জার্মানির নীতি তাদের ভাগ্যকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। এই দ্ব্যর্থহীন বাস্তবতার মাঝে সাধারণ মানুষদের জীবন, আশা এবং মানবিক অধিকার প্রতিদিন পরীক্ষার মুখে রয়েছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অবলম্বনে অনুবাদ : মারিয়া হাসিবা
নিউজ বাংলা চ্যানেল