সমুদ্র থেকে উঠে আসা এক বিশাল দ্বৈত্য-দর্শনেই ভয়ংকর, কিন্তু তার নির্মমতা আসলে প্রতীকী। রক্ত-মাংসের নয়, এই দানব তৈরি হয়েছে মানুষের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা সীগাল পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাস্কর্য যেন প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে।
প্লাস্টিকের এই বিশাল দানবটি নির্মাণ করেছে জেলা প্রশাসন কক্সবাজার ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।
বুধবার (৩ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় সৈকতের বালিয়াড়িতে স্থাপন করা এ ভাস্কর্য উদ্বোধন করা হয়েছে। উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শহীদুল আলম, বিচ ম্যাজিস্ট্রেট আজিম উদ্দিন, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের গভর্নিং বডির সদস্য জামাল উদ্দিন প্রমুখ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বালিয়াড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীকে দু’ভাগ করে ফেলা এক বিশাল প্লাস্টিক দানব। তার বুক চিরে বেরিয়ে এসেছে প্লাস্টিক। যেন এই গ্রহ দমবন্ধ পরিস্থিতিতে টিকে থাকার লড়াই করছে। দানবের চোখ-নাক-মুখে নেই জীবন্ত বৈশিষ্ট্য, কিন্তু তার প্রতীকী হিংস্রতায় ফুটে উঠেছে মানবদেহ, প্রকৃতি আর প্রাণবৈচিত্র্য কীভাবে প্লাস্টিকের থাবায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।
প্রথম দেখায় যেকোনো পর্যটক ভয় পেতে পারেন। কিন্তু কাছে যেতেই বোঝা যায় এটি মানুষের অবহেলা, লোভ আর দায়িত্বহীনতার প্রতীক।
বিদ্যানন্দের বাংলাদেশব্যাপী প্লাস্টিক রিসাইকেল কর্মসূচির অংশ হিসেবে স্বেচ্ছাসেবীরা গত চার মাসে কক্সবাজার, ইনানী ও টেকনাফ সৈকত থেকে সংগ্রহ করেছেন প্রায় ৮০ মেট্রিক টন সামুদ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্য। সেই সঞ্চিত প্লাস্টিকের একটি অংশ দিয়ে তৈরি হয়েছে এই ‘দানব’।
এ ভাস্কর্যের নকশা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ভাস্কর ও শিল্পী আবীর কর্মকারের নেতৃত্বে একদল শিল্পী। তিনি জানান, প্রায় ৬ মেট্রিক টন প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই বিশাল কাঠামো। তাদের দাবি, এটি ওসান-প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘প্লাস্টিক দৈত্য’। শিল্পীরা প্লাস্টিকের পাশাপাশি ব্যবহার করেছেন কাঠ, পেরেক, সুতো, আঠা এবং নানা উপকরণ। নির্মাণে সার্বিক সহায়তা করেছে পপ-ফাইভ অ্যাডভার্টাইজিং লিমিটেড।গত ৩ আগস্ট সৈকতে উদ্বোধন করা হয় ‘প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ স্টোর ও মার্কেট’। যেখানে প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে মানুষ পাচ্ছেন চাল, ডাল, তেল, লবণসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য এবং পর্যটকরা জিতে নিচ্ছেন বই, ক্যাপ, ব্যাগসহ নানা উপহার। এই কার্যক্রমেই সংগ্রহ হয়েছে ৮০ মেট্রিক টন প্লাস্টিক।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘সমুদ্রসৈকতকে প্লাস্টিক দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে বিদ্যানন্দের এ উদ্যোগ কার্যকর ও টেকসই। ভাস্কর্য ও তিনমাসব্যাপী চিত্র প্রদর্শনী পর্যটকদের সচেতনতায় বড় ভূমিকা রাখবে।’
বিদ্যানন্দের গভর্নিং বডির সদস্য জামাল উদ্দিন বলেন, ‘সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্লাস্টিক বিরোধী যে নীতি নিয়েছে, আমরা স্বেচ্ছাশ্রমে সারাদেশে ৫০০ মেট্রিক টন প্লাস্টিক রিসাইকেল করে তাতে সহায়তা করছি। কক্সবাজারে আগামী ৬ মাস ধরে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হবে। মানুষকে জানাতে চাই, প্লাস্টিক বর্জ্যও সম্পদে পরিণত হতে পারে।’
পর্যটন মৌসুমজুড়ে ভাস্কর্যটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এখানেই আয়োজন করা হবে পথনাটক, সংগীতানুষ্ঠান এবং অন্যান্য সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড।
বুধবার সন্ধ্যায় ভাস্কর্যটি ঘিরে ভিড় জমায় স্থানীয় ও পর্যটকরা। অনেকে বলছেন, ‘দানবটি ভয়ংকর, কিন্তু বার্তাটি আরও ভয়ংকর। আমরাই প্রকৃত দানব হয়ে সমুদ্রকে নষ্ট করছি।’২০২২ সালে প্রথম তৈরি হয়েছিল প্লাস্টিক দানব। এবারে এটি আরও ভয়ংকর রূপে ফিরেছে সঙ্গে আরও দুটি ছোট দানব নিয়ে। বার্তাটি স্পষ্ট- প্লাস্টিক দূষণ কমেনি, বেড়েছে। প্রতীকী দানবেরা সতর্ক করছে, এভাবে চলতে থাকলে মানুষই ধীরে ধীরে গ্রাস হবে নিজের তৈরি প্লাস্টিকের দানবে।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য কক্সবাজার বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর অঞ্চল। আর এ দানব যেন দাঁড়িয়ে আছে সতর্কবার্তা হয়ে- মানুষ যদি এখনই না থামে, প্লাস্টিকই গ্রাস করবে পৃথিবীকে। এই ভাস্কর্য তাই শুধু শিল্পকর্ম নয়, এটি একটি আহ্বান। ‘প্লাস্টিক কমাও, পৃথিবী বাঁচাও।’
খবর- সময়ের আলো
নিউজ বাংলা চ্যানেল