শুক্রবার দেওয়া রায়ে সাংবিধানিক পরিষদ জানায়, নিষেধাজ্ঞার বিধানটি উপযুক্ত, প্রয়োজনীয় কিংবা মাত্রানুযায়ী ছিল না। গত জুলাইয়ে ফরাসি আইনপ্রণেতারা ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার আগেই তা বাতিল হয়ে গেল। সাংবিধানিক পরিষদ জানিয়েছে, তারা আইনের প্রথম ধারা পর্যালোচনা করেছে। ওই ধারায় ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার বিধান ছিল।
বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থাও আদালতের উদ্বেগের কারণ হয়েছে। অনলাইন সেবা ব্যবহারের আগে ব্যবহারকারীর বয়স প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যসহ অন্যান্য অধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না বলে জানিয়েছে পরিষদ।
রায়ের পর নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখো। তিনি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুকে নতুন একটি খসড়া আইন প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, নতুন আইন তৈরির সময় সাংবিধানিক পরিষদের পর্যবেক্ষণগুলো বিবেচনায় রাখা হবে।
সরকার দ্রুত নতুন খসড়া তৈরির কাজ শুরু করবে এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিকেই নতুন সংস্কার কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে বলে ম্যাখোর দপ্তর জানিয়েছে। গত মাসে আইনপ্রণেতারা বিলটি পাস করার পর এর কিছু অংশ পর্যালোচনার জন্য সাংবিধানিক পরিষদে পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু। ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদে নয়জন সদস্য রয়েছেন এবং কোনো আইন দেশটির সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করে এই পরিষদ।
বাতিল হওয়া আইনে সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ বছরের কম বয়সীদের নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট খোলার ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছিল। নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরির সময় ব্যবহারকারীর বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা ছিল। পরবর্তী সময়ে আগামী জানুয়ারি থেকে পুরোনো অ্যাকাউন্টগুলোর ক্ষেত্রেও একই বয়স যাচাইয়ের নিয়ম কার্যকর করার কথা ছিল। প্রেসিডেন্ট ম্যাখো এর আগে সেপ্টেম্বর থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে আইনটি নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছিল। বিরোধীরা বিশেষ করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও বয়স যাচাইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ব্যবহারকারীর বয়স নির্ভুলভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে কি না, প্রযুক্তিগতভাবে তরুণরা এই ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারবে কি না এবং এত অল্প সময়ে এত বড় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব—এসব বিষয়েও প্রশ্ন ছিল। সাংবিধানিক পরিষদের রায়ে বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থার বিষয়ে এই উদ্বেগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপে অস্ট্রেলিয়াও বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ডিসেম্বরে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে দেশটি। এর মাধ্যমে বিশ্বে প্রথম জাতীয় পর্যায়ে এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নকারী দেশ হয় অস্ট্রেলিয়া। তবে নিষেধাজ্ঞা চালুর পরও দেশটির অনেক মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে চলেছেন বলে ব্যাপকভাবে স্বীকার করা হয়। ফ্রান্সও একই ধরনের উদ্যোগ নিতে চেয়েছিল, কিন্তু সাংবিধানিক পরিষদের রায়ের পর তাদের পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে।
শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গত কয়েক মাসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এ বিষয়ে বিধিনিষেধ জোরদারের আলোচনা হয়েছে। মে মাসে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন ইউরোপীয় ইউনিয়নে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কয়েক মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে নতুন আইন প্রস্তাব করা হতে পারে বলেও তিনি জানান।
এদিকে যুক্তরাজ্যও শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধের পরিকল্পনা করছে। জুনে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ঘোষণা দেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের জন্য রাত ১২টার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করার একটি ঐচ্ছিক ব্যবস্থার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
নিউজ বাংলা চ্যানেল