ঢাকা | খ্রি.

জাহাজভাঙা শিল্পে এক দশকে ১০৪ শ্রমিকের মৃত্যু

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 15, 2026 ইং | Photo Card
জাহাজভাঙা শিল্পে এক দশকে ১০৪ শ্রমিকের মৃত্যু ছবির ক্যাপশন: ছবি সংগৃহীত
ad728
নিউজ বাংলা ডেস্ক : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় গত ১০ বছরে ১০৪ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও কয়েক শ শ্রমিক। সর্বশেষ শুক্রবার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। জাহাজভাঙা শিল্পের ৬৬ বছরের ইতিহাসে একদিনে এত শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা এটিই প্রথম বলে খবরের কাগজ জানিয়েছে।

ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আলী শাহীন জানান, গত এক দশকে জাহাজভাঙা শিল্পে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১০৪ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ সময়ে আহত শ্রমিকের সংখ্যাও কয়েক শ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই শিল্পে দুর্ঘটনায় ৫০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ শুক্রবারের ঘটনায় নয়জন নিহত হওয়ায় চলতি বছর দুটি দুর্ঘটনায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২।

শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারীর ওই ঘটনায় নিহতরা হলেন মো. রানা (২৫), মো. ইদ্রিস (৩০), মো. সুজন (৩৮), পলাশ জলদাস (৩০), সানি জলদাস (২২), দুই সহোদর মনসুর উদ্দিন (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮), হাবিবুর রহমান (৫০) এবং মতিউর রহমান (২০)।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম জানান, রাতে মতিউর রহমান নামে এক শ্রমিককে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত অবস্থায় নেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে আরও সাতজন চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে জাহাজের ট্যাংকে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, এলএনজি পরিবহনকারী এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে সেটিকে সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস থাকতে পারে।

তার ধারণা, ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজ কাটার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। পাশাপাশি কারখানাটির নিরাপত্তাব্যবস্থাও দুর্বল ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্তের অভিযোগ, এখনো চরম ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকদের কাজ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি এই খাতে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। শ্রমিকদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করানো হলেও সে অনুযায়ী মজুরি দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইনও অনুসরণ করা হয় না।

তপন দত্ত আরও বলেন, শিপইয়ার্ডগুলোতে নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকলেও সেগুলোর নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির পাশাপাশি মালিকপক্ষের অবহেলার অভিযোগও রয়েছে। গত ১৫ জুলাই সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে শ্রম আদালতে মামলা করেছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান জানান, শিপইয়ার্ড পরিদর্শনের সময় কর্মকর্তারা বিভিন্ন ধরনের ব্যত্যয় দেখতে পান। এরপর গত ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এতে কোনো কাজ না হওয়ায় ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা করা হয়। তার মতে, এ ঘটনায় মালিকপক্ষের গাফিলতির বিষয়টি স্পষ্ট।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৩০টি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড রয়েছে। আরও ৩৫ থেকে ৪০টি ইয়ার্ডকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের কাজ চলছে। একটি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড স্থাপনে কমপক্ষে ৭০ থেকে ১০০ কোটি টাকা প্রয়োজন।

বিলসের কো-অর্ডিনেটর ও শ্রমিক নেতা ফজলুল কবির মিন্টুর মতে, জাহাজভাঙা কারখানার মালিকরা স্ক্র্যাপ জাহাজ কেনার জন্য ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেন। সেই ঋণ পরিশোধের চাপ থাকায় ঠিকাদারদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাহাজ কাটার জন্য তাগাদা দেওয়া হয়।

তার ভাষ্য, দ্রুত কাজ শেষ করতে গিয়ে ঠিকাদাররা শ্রমিকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই কাজ করান। নিরাপত্তা সরঞ্জামের সংকট এবং দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ থেকেই শ্রমিকের মৃত্যু ও অঙ্গহানির ঘটনা ঘটে। তিনি জানান, ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই শিল্পে ৫০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬০ সালে। ওই সময় একটি ঘূর্ণিঝড়ে আটকে পড়া জাহাজ কেটে ফেলার মধ্য দিয়ে এ শিল্পের সূচনা। পরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জাহাজ ‘আল আব্বাস’ কাটা হয়।

১৯৭৪ সালের দিকে কর্ণফুলী মেটাল ওয়ার্কস বাণিজ্যিকভাবে জাহাজভাঙার কার্যক্রম শুরু করে। এরপর সীতাকুণ্ড উপকূলে দেশের প্রথম ও একমাত্র জাহাজভাঙা শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠে।

শিল্পটির যাত্রার ৬৬ বছর পার হলেও শ্রমিকদের নিরাপত্তা এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে। একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনায় সেই উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : নিউজ বাংলা চ্যানেল

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ