নিউজ বাংলা ডেস্ক: ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকাই সিনেমার আকাশ থেকে ঝরে পড়েছিল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মাত্র ২৪ বছর বয়সে জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর ঝুলন্ত মরদেহ রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। সেই ঘটনার পর যে প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল, প্রায় তিন দশক পরও তার চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি।
শুরুতে ঘটনাটি অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে তদন্ত হলেও পরে তা হত্যা মামলায় রূপ নেয়। দীর্ঘ সময় ধরে একাধিকবার বদলেছে তদন্তের দিক ও ব্যাখ্যা। এবার সেই বহুল আলোচিত মামলায় নতুন মোড় এনে দিয়েছে সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও অভিনেতা আশরাফুল হক ডনের (৫৪) গ্রেফতার।
সম্প্রতি সৌদি আরব যাওয়ার পথে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৪ আগস্ট গ্রেফতারের খবর প্রকাশের পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে প্রায় ৩০ বছর ধরে অমীমাংসিত সেই প্রশ্ন—সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য কী?
নায়ক-খলনায়কের পর্দার সম্পর্ক, বাস্তবে বন্ধুত্ব
একসময় একই সিনেমায় অভিনয় করেছেন সালমান শাহ ও আশরাফুল হক ডন। একজন ছিলেন নায়ক, অন্যজন খলনায়ক। তবে বাস্তব জীবনে তাদের মধ্যে ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ও পারিবারিক সম্পর্ক।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর মুক্তি পাওয়া কয়েকটি সিনেমায় তার কণ্ঠ নকল করে ডাবিংও করেছিলেন ডন। ‘আনন্দ অশ্রু’ ও ‘সত্যের মৃত্যু নেই’সহ একাধিক ছবিতে সালমানের চরিত্রে তার কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়। সেই মানুষটিই এখন সালমান শাহ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে গ্রেফতার হয়েছেন।
কীভাবে মামলায় এল ডনের নাম
সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে হত্যার অভিযোগ সামনে আসে। ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে ঘটনাটি পুনরায় হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের গতি পায়।
রমনা থানায় দায়ের করা মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হককে প্রধান আসামি এবং আশরাফুল হক ডনকে অষ্টম আসামি করা হয়। মামলায় মোট ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে দাবি করা হয়, সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
তবে কোনো মামলায় আসামি হওয়া এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ডনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক সত্যতা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
গ্রেফতারের আগে কী বলেছিলেন ডন
মামলায় নাম আসার পর ডন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি গণমাধ্যমে বলেন, তার পালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই এবং সামিরা হকও নির্দোষ।
কিন্তু সেই বক্তব্যের প্রায় এক বছর পর বিদেশযাত্রার সময় বিমানবন্দরে তাকে গ্রেফতার করা হয়, যা তদন্তে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
কেন সৌদি আরব যাচ্ছিলেন?
২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালত ডন ও সামিরা হকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। সেই আদেশের পরও কীভাবে তিনি বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করলেন—এটি এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
তার ভ্রমণের উদ্দেশ্য কী ছিল, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছালেন এবং এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
১২ লাখ টাকার কথিত চুক্তির অভিযোগ
মামলাকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো—সালমান শাহকে হত্যার জন্য ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার একটি কথিত চুক্তি হয়েছিল।
তবে এটি বর্তমানে মামলার অভিযোগ বা তদন্তসংশ্লিষ্ট দাবি মাত্র; আদালতে প্রমাণিত কোনো সত্য নয়। তদন্তকারীদের এখন খতিয়ে দেখতে হবে, এ দাবির পক্ষে কোনো বাস্তব তথ্য-প্রমাণ রয়েছে কি না।
তিন দশক পর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি
সালমান শাহ হত্যা মামলার দীর্ঘ ইতিহাসের পর এবার ডন পুলিশের হেফাজতে। তার জিজ্ঞাসাবাদ থেকে নতুন কোনো তথ্য বেরিয়ে আসে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তদন্তকারীরা জানতে চাইতে পারেন—সালমান শাহর সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রকৃতি, মৃত্যুর আগে ও পরে কারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, ঘটনার দিন তিনি কোথায় ছিলেন এবং কোনো পরিকল্পনা বা বৈঠকের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন কি না।
রহস্যের শেষ কোথায়?
সালমান শাহ শুধু একজন জনপ্রিয় নায়কই ছিলেন না; নব্বইয়ের দশকের তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। তাই তার মৃত্যু সাধারণ কোনো ঘটনা হয়ে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে এ ঘটনার সঙ্গে আরও অনেকের নাম আলোচনায় এসেছে—প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, চিত্রনায়িকা শাবনূর, সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, মেকআপ শিল্পী রুবি এবং লন্ডনপ্রবাসী রিজভী নামের এক ব্যক্তিসহ আরও কয়েকজন।
আশরাফুল হক ডনের গ্রেফতার সেই দীর্ঘদিনের আলোচিত মামলাকে আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
তবে গ্রেফতারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করতে হবে, আর তদন্তকে বের করতে হবে প্রকৃত সত্য। প্রায় ৩০ বছর ধরে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে কি না, তা এখন নির্ভর করছে তদন্তের ফলাফল ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর।
নিউজ বাংলা চ্যানেল